সিরাজউদ্দিন আহমেদ
তরু পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। শিশুবেলাটা আনন্দেই কেটেছে। যেই একটু বড় হলো, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, যন্ত্রণাটা তখন থেকে শুরু। স্কুল বন্ধ। নির্জন দুপুরে জানালার ধারে বসে তরু একটি বই পড়ছে। কিছুক্ষণ পরপর ফ্রকের ঝুল দিয়ে চোখ মুছছে। তরুর খুব কষ্ট হচ্ছে। বইটি রেখে দিলে তার কষ্ট বন্ধ হয়। কিন্তু বইটি সে রাখতে পারছে না। বরং কী এক বিষাদ মগ্নতায় সে বই আঁকড়ে আছে।
ঠিক তখন বড়পা কলেজ থেকে ফিরল। তরুকে দেখে জিজ্ঞেস করল, সে কী পড়ছে। তরু জানাল সে খুব দুঃখের একটা বই পড়ছে, হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে। বড়পা চমকে উঠে তরুর হাত থেকে বইটি ছিনিয়ে নিল। রাগত স্বরে জিজ্ঞেস করল, বইটি কোথায় পেয়েছে। তরুর মনে হলো সে কোনো অন্যায় করেছে। নতমুখে জানাল, সে বড়পার বুক সেলফ থেকে নিয়েছে। বড়পা তাকে ধমক দিয়ে বলল, পারমিশন ছাড়া বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করা ঠিক নয় এবং এই বই পড়ার বয়স তার এখনো হয়নি।
শিক্ষা নিয়ে
০৭ এপ্রিল ২০২৬
বড়ভাই ইউনিভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে বিছানায় আছড়ে পড়ে চিৎকার শুরু করে, তরুর এক গ্লাস পানি আনতে কতক্ষণ লাগে। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে ছুটা গৃহকর্মীর সঙ্গে ধাক্কা লেগে তরুর হাত থেকে গ্লাস পড়ে ভেঙে যায়। ভাইয়া না দেখেই চেঁচামেচি শুরু করে। মা ছুটে এসে তরুকে জড়িয়ে ধরেন এবং ভাইয়াকে বকা দিয়ে বলেন, এখন থেকে নিজের পানি নিজে খেতে।
সবাই তার দোষ ধরে, বকাঝকা করে, তখন তরুর খুব রাগ হয়। সে তখন বাড়ির একমাত্র কদমগাছটির কাছে চলে যায়। গাছের কাছে তার রাগ, দুঃখ, আনন্দ সব বলে। গাছ খুব ভালো শ্রোতা, কোনো প্রতিবাদ করে না। কথা শেষ হলে তরুর রাগ হয় যে গাছটি কোনো উত্তর দেয় না।
তরু যখন আরো ছোট ছিল, তখন সে ঝগড়া ঝগড়া খেলা খেলত। সেই খেলায় তরুর সঙ্গে কেউ কথায় পেরে উঠত না। আজ তরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের শেষ বর্ষের ছাত্রী। আজ তার প্রথম কনে দেখা অনুষ্ঠান। পাত্র তমাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দেখতে সুবোধ বালকের মতো। তিন মিনিট ধরে শূন্যঘরে তারা মুখোমুখি বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। তরু খুক খুক করে কাশলে তমাল জিজ্ঞেস করে তার ঠান্ডা লাগছে কি না। তরু জানায় সে কথা বলার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তমালের সুন্দর বাচনভঙ্গি তরুকে মুগ্ধ করে।
এক মাসের মধ্যে তরু ও তমালের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর তরুর শাশুড়ি তার অনেক যত্ন নেন। কিন্তু তরুর মনে হয় তমালের কোনো রাগ বা বিরক্তি নেই। সে যেন এক রোবট। তরুর ইচ্ছে করে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করতে। একদিন তরু ইচ্ছে করে তমালকে তেতো করলা ভাজি খেতে দেয়। তমাল খেতে গিয়ে বমি করে ফেলে। তরু কেঁদে ওঠে এবং শাস্তি চায়।
তমাল তখন তাকে মেহগনি গাছের গল্প শোনায়। সে জানায়, গাছ যেমন নিঃস্বার্থভাবে জীবজগতের উপকার করে, তেমনি মানুষও গাছের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারে। তমাল চায় তারা দুজন মিলে বৃক্ষের মতো ভালোবাসায় নিবেদিত হবে। তরু ফিসফিস করে বলে, তারা হবে প্রথম বৃক্ষ মানব মানবী। কিন্তু তমাল তাকে বুকে টেনে নিয়ে বলে, তাদের মিলনে যে আসবে সে হবে প্রথম বৃক্ষ মানব।
